মঙ্গলবার, ২২ জুন ২০২১, ০৪:৪০ অপরাহ্ন

কুষ্টিয়া গড়াই নদী খননে টাকার ছড়াছড়ি হলেও ফলাফল শুন্য, দুর্নীতির অভিযোগ
ফয়সাল ইকবল
Update : মঙ্গলবার, ২২ জুন ২০২১

সত্যখবর ডেস্ক ।। ৫ এপ্রিল ২০২১ ।

 

বিশেষ প্রতিবেদক ॥ খননে অনিয়ম, ড্রেজার থেকে তেল চুরি সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জাবাবে পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক বলেছিলেন, যদি কোনো প্রমাণ থাকে, সেটা নিয়ে আসেন, আমি তাঁর (কর্মকর্তা) বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নিচ্ছি সেটা দেখেন। ২০১৯ সালের ২৬ এপ্রিল শুক্রবার  দুপুরে কুষ্টিয়া শহর–সংলগ্ন হরিপুর ইউনিয়নে পদ্মা-গড়াই মোহনায় খননকাজ পরিদর্শন শেষে অসন্তুষ্ট হয়ে তিনি এ সিদ্ধান্ত জানিয়েছিলেন।

 

তবে এর পর ওই সকল কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কি ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে, কি হয়েছে তা কারো জানা নেই। ওই দিন পরিদর্শন শেষে প্রতিমন্ত্রী সাংবাদিকদের আরও বলেছিলেন এভাবে চলতে দেওয়া যাবে না। এখন যেটা করা হচ্ছে, সেটা বলতে গেলে নালার মতো খনন করা হচ্ছে। এটাকে আরও চওড়া করতে হবে। পদ্মার পানি এনে গড়াইয়ে ফেলতে হবে। এ জন্য এখনই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং সেটা মন্ত্রণালয় থেকে বাস্তবায়ন করা হবে।

 

তিনি জানিয়েছিলেন ৩০০ মিটার চওড়া করে খনন করা হবে। তিনটি ড্রেজার কাজ করছে। আরও দুটি ড্রেজার আনা হবে। সব মিলিয়ে পাঁচটি ড্রেজার দিয়ে রাত–দিন কাজ শুরু করবে। এই মুহুর্তে যে দুটি ড্রেজার দিয়ে কাজ চলছে, সেটা বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সঠিক পরিকল্পনা করে ৩০০ মিটার চওড়া খনন করে পদ্মার পানি গড়াইয়ে প্রবাহিত করা হবে।জানা যায়, কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর সাহিত্যে গড়াইকে ভালোবেসে লিখতেন গৌরী ।

 

 

আর পল্লী কবি জসিম উদ্দিন  নীড় কবিতায় জানিয়েছেন গড়াই নদীর প্রতি তাঁর চুম্বক ভালোবাসার কথা। দুই কবির ভালোবাসার সেই গড়াই এখন ভালো নেই। নদী আছে, পানি নেই। মাছ নেই, তাই জেলেরও দেখা নেই। নৌকা হয়েছে উধাও। বুকজুড়ে শুধু বালুচর। সেই বালু সরাতে বছর বছর আসে প্রকল্প। প্রকল্পের মোড়কে বরাদ্দ হয় কোটি কোটি টাকা। ২০ বছর ধরে শুধু সেই টাকার গড়াগড়িই আর ছড়াছড়ি চলছে গড়াই নদীর বুকে। কাজের কাজ কিছুই হয়নি।

 

শুকনো মৌসুমে পানিপ্রবাহ সচল রাখা, লবণাক্ততা রোধ ও নাব্যতা রক্ষায় গত ২০ বছরে এক হাজার ৬৬৩ কোটি টাকা ব্যয়ে কুষ্টিয়ার গড়াই নদ খনন করা হলেও এর সুফল ধরা দেয়নি কখনো। সুন্দরবনে মিঠা পানির সরবরাহ স্বাভাবিক রাখাসহ লোনা পানির আগ্রাসন ঠেকাতে নেওয়া গড়াই খনন প্রকল্প এখন ঠুঁটো জগন্নাথ। এর পরও সরকার এ বছর গড়াই খননে ফের ৫৯০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে।

 

কুষ্টিয়া শহরের শহরের বড়বাজার এলাকার ব্যবসায়ী রইচ উদ্দিন বলেন, নদী খননে আমরা কোনো সুফল দেখছি না। খনন করা বালু নদীর তীরে ফেলা হয়েছে, আবার সেই বালু ফের নদীতেই আইছে।কুমারখালীর দুর্গাপুরের হাবিব চৌহান বলেন, নদী খনন করে সাধারণ মানুষের কোনো লাভ না হলেও খননকাজে জড়িত কর্মকর্তা ও প্রকৌশলীদের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়েছে।

 

খোকসার গড়াই তীরের বাসিন্দা ফিরোজ হোসেন বলেন, নদী খননের নামে ২০ বছর ধরে ড্রেজার দিয়ে নদীতে বালু তুলতে দেখি; কিন্তু বর্ষা শেষ হলে নদীতে আর পানি থাকে না। তাহলে খননের নামে হাজার কোটি টাকা গেল কোথায়  ? খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পদ্মার শাখা নদী গড়াই দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে মিঠা পানি সরবরাহের একমাত্র উৎস। নদটি প্রথম খনন হয় ১৯৯৭ সালে।

 

এলাকাবাসীর অভিযোগ, সে সময় ৪২০ কোটি টাকা ব্যয়ে কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচির আওতায় কোদাল দিয়ে নদী খনন করা হলেও সে সময় খননের নামে টাকার হরিলুট করা হয়েছিল। পরে ১৯৯৯ সালে ২৭৪ কোটি টাকা ব্যয়ে দ্বিতীয় পর্যায়ে স্থানীয়ভাবে নদী খনন করেছিল পানি উন্নয়ন বোর্ড। এর পর সরকারের অর্থায়নে ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে গড়াই নদ পুনরুদ্ধার প্রকল্পের আওতায় তৃতীয় পর্যায়ে ৯৪২ কোটি টাকা ব্যয়ে গড়াই খনন ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ২০০৯-১০ সালে চার বছর মেয়াদি একটি প্রকল্প অনুমোদন হয়।

 

পরবর্তী সময়ে দরপত্রের মাধ্যমে চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দ্য চায়না হারবার ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানী লিমিটেড  নদী খননের দায়িত্ব পায়। দুই বছরের চুক্তিতে কোম্পানীতে ২০১০ সালের ২৯ অক্টোবর থেকে গড়াই নদের উৎস মুখ তালবাড়িয়া থেকে খোকসা জানিপুর পর্যন্ত ৩০ কিলোমিটার ভাটিতে খননকাজ শেষ করে। পরের দুই বছর পাউবোর নিজস্ব প্রকৌশলীরা এই খননকাজ তদারকি করেন। এর পর ফের ২০১৫-১৭ সালে তিন বছরের একটি খনন প্রকল্প নেয়।

 

সর্বশেষ ২০১৯ সালে নতুন করে ৫৯০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা চার বছর ধরে চলবে। এই খননের সঙ্গে সাত কিলোমিটার নদীতীরও সংরক্ষণ কাজও রয়েছে।এর আগে ২০১৩ সালে কুষ্টিয়া জেলা উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির সভায় অপরিকল্পিতভাবে গড়াই নদ খনন এবং তাতে ব্যাপক অনিময় ও লুটপাট হচ্ছে বলে কমিটির সদস্যরা অভিযোগ করলে কুষ্টিয়ার সাবেক জেলা প্রশাসক সৈয়দ বেলাল হোসেন খনন পরিদর্শন করে নানা অনিয়ম চিহ্নিত করে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠান।

 

এর পর মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন সিনিয়র সচিব শেখ আলতাফ আলী তদন্ত শেষে খনন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) আব্দুল বাতেনকে সাময়িক বরখাস্ত করে ওএসডি এবং প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলী সাইদ আহম্মেদকে প্রত্যাহার করেছিলেন। কুষ্টিয়া আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আজগর আলী জানান, একের পর এক প্রকল্পে হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে কয়েক বছর ধরে নদী খনন হচ্ছে অথচ সাধারণ মানুষ এর কোনো সুফল পাচ্ছে না।

 

দুর্নীতি-অনিয়ম তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে আরো টাকা ঢেলেও নদীতে পানি পাওয়া যাবে না। নদী বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশবিদ ড. অনোয়ারুল করিম বলেন, সুন্দরবনকে বাঁচানো এবং এ অঞ্চলের লবণাক্ততা কমানোই ছিল গড়াই খননের প্রধান লক্ষ্য। তুলে আনা বালু নদীর পাড়ে ফেলার কারণে খননের উদ্দেশ্য পুরোপুরি ভেস্তে গিয়ে সরকারের হাজার কোটি টাকা জলে চলে যাচ্ছে।

 

গড়াই নদী পানিপ্রবাহ সচল রাখতে প্রস্তাবিত গঙ্গা ব্যারাজ বাস্তবায়ন করতে হবে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের হিসাব অনুযায়ী, গড়াই নদ খননকাজে দুটি ড্রেজার কেনার জন্য ২৩৪ কোটি টাকা ব্যায়সহ নদী খননে ২০১০-১১ অর্থবছরে ১৩০ কোটি টাকা, ২০১১-১২ অর্থবছরে ৭৫ কোটি টাকা, ২০১২-১৩ অর্থবছরে ১৭ কোটি টাকা, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ৩৮ কোটি টাকা এবং পরের ২০১৪-১৭ অর্থবছরে আরো ২৬ কোটি টাকা এবং গড়াইয়ের উৎস মুখে দুটি ফ্লো ডিভাইডার নির্মাণের জন্য ২৭০ কোটি টাকা ও দুটি গাইড ওয়াল নির্মাণের জন্য ১২০ কোটি টাকাসহ মোট ব্যয় হয়েছে ৯১৯ কোটি টাকা।

 

তবে সরেজমিনে দুটি ফ্লো ডিভাইডার ও দুটি গাইড ওয়াল নির্মাণের কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পাউবোর একাধিক কর্মকর্তা জানান, ২০০৯-১০ থেকে ২০১২-১৪ মেয়াদের গড়াই খননকাজের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় খনন এলাকা পরিদর্শন করে বিভিন্ন অনিয়মের পাশাপাশি গড়াই খনন করে বালু ও মাটি নদীপারেই ফেলায় বর্ষায় এসব বালু ফের নদীতে চলে যাওয়ায় খননের উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়েছে বলে চিহ্নিত করেছিল।

 

পানি উন্নয়ন বোর্ড সুত্রে জানা গেছে, গড়াই খনন প্রকল্পের যে উদ্দেশ্য সেটা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে হলে এখানে প্রতিবছরই খনন অব্যাহত রাখতে হবে। কেননা খননের পর পরই নতুন করে বালু ভরাট হয়ে যাচ্ছে। আগে কোথায় কী দুর্নীতি হয়েছে তা তাদের জানা নেই। তবে প্রতিবছর গড়াই খনন করা না হলে কাজের কাজ কিছুই হবে না। তাই এবারও চার বছর মেয়াদি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে।

 

সুত্রটি আরো বলেন,  প্রকল্প অনুমোদনের সময় যা বরাদ্দের কথা বলা হয়েছিল বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সেই বরাদ্দ পাওয়া যায়নি। আর নদীতে যেখানে কোনো ফ্লোই নেই সেখানে ফ্লো ডিভাইডারও নির্মাণ করা হয়নি। এ সব বিষয়ে কথা বলতে কুষ্টিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মনিরুজ্জামানের মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।

আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
জনপ্রিয়
সর্বশেষ সংবাদ
copyright protected
%d bloggers like this: